আজকে আমরা কাপড়ের শক্তি নির্ণয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা টেক্সটাইল টেস্টিং অ্যান্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল ৩ এর কাপড়ের টেনসাইল গুণাবলির অন্তর্গত।

কাপড়ের শক্তি নির্ণয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি (Different methods of fabric strength measurement)
পরীক্ষণীয় কাপড়ের ধরন এবং ব্যবহৃত যন্ত্রের ধরনের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন পদ্ধতিতে কাপড়ের শক্তি নির্ণয় করা যেমন-
১। টেনসাইল স্ট্রেংথ পরীক্ষা (Tensile strength test)
এ ক্ষেত্রে কাপড়ের টানা ও পড়েনের দিকে কাপড়ের ব্রেকিং স্ট্রেংথ (Breaking strength) বা ছিঁড়ে যাওয়ার শক্তি নির্ণয় করা যায়। যা তিনভাবে বের করা যায়, যেমন-
(ক) স্লিপ মেঘড (Surp method) এটা আবার দুই প্রকার, যেমন-
(i) রেভেলন স্লিপ মেঘ (Revelled strip method)
(ii) কাট স্লিপ দেখ (Cut strip method)
(খ) যাব টেস্ট (Grab test)
(গ) মডিফাইড হাব টেস্ট (Modified grab test)
২। টিয়ারিং টেস্ট (Tearing test) :
এটি দু’ প্রকার, যেমন-
(ক) ট্রাপিজয়েড টিয়ার টেস্ট (Trapezoid tear test)
(খ) টাং গ্লিয়ার টেস্ট (Tongue tear test)
৩। বার্সিং টেস্ট (Bursting test)।
স্লিপ টেস্ট (Strip test)
স্লিপ শব্দের অর্থ সরু ফালি কাপড়ের সরু ফালি বা টুকরা পরীক্ষা করা হয় বলে এ পরীক্ষার নাম স্লিপ টেস্ট। কাজেই স্লিপ পদ্ধতিতে কাপড়ের যে দিকে (টানা বা পড়েন) পরীক্ষা করতে হবে সে দিকের একটি নির্দিষ্ট মাপের সক ফালি নিয়ে এ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
(i) রেকেলড স্লিপ টেস্ট (Revelled strip test)
(এই পরীক্ষার সময় যে কাপড় নেয়া হয় তার বুনন একটি নির্দিষ্ট নিয়নে খুলে তারপর শক্তি নির্ণয় করা হয় বলে এ পরীক্ষার নাম রেভেলড স্ট্রিপ টেস্ট। এ পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থের কাপড় ছিঁড়তে কী পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন তা পাওয়া যায় এবং এর সাথে বুননের পূর্বে ও পরে সুতার শক্তির একটা তুলনা করা যায়। রেফেলড স্লিপ টেস্টের যন্ত্রে দুটি ক্ল্যাম্প A ও B যার মাপ ১x১.৫” বা তার বেশি থাকে। নিচের ক্ল্যাম্প প্রতি মিনিটে ১২ ইঞ্চি গতিতে নিচের দিকে নামে।
যে কাপড়ের শক্তি নির্ণয় করা হবে তা সাধারণত ৮” x ২” হয় তবে যা ২.৫” কেটে তার দুই পাশ থেকে সুতা সরিয়ে ২ ইঞ্চি করা হয়। আবার কাপড়কে দৈর্ঘ্যের দিকে ক্ল্যাম্পের মধ্যে ভালভাবে আটকানোর জন্য দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি দেয়া হয়। পরীক্ষার শুরুতে দুই ফাঁকের মধ্যবর্তী কাপড়ের দূরত্ব ৩ ইঞ্চি থাকে। এখন মেশিন চালু করলে যে শক্তিতে বা ওজনে কাপড়টি ছিঁড়ে যাবে তা ঐ কাপড়ের শক্তি হিসাবে গণ্য হবে।

(ii) কার্ট স্ট্রিপ (Cut strip) :
কোটেট কাপড়, ফেন্টেড কাপড় বা অধিক মাড়যুক্ত কাপড় যাদের পাশ থেকে সুতা খুলে নেয়া সহজ নয় এমন কাপড়ের ক্ষেত্রে কাট স্ট্রিপ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। অর্থাৎ কাপড়ের টুকরা যত্নের সাথে কেটে সরাসরি নমুনা নির্বাচন করা হয়। এ পদ্ধতি পরীক্ষা ও অন্যান্য সবকিছু রেভেলড পদ্ধতির অনুরূপ।
গ্রাব টেস্ট (Grab test) :
এ পদ্ধতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশি ব্যবহৃত হয়। স্ট্রিপ পদ্ধতির চেয়ে এ পদ্ধতিতে পরীক্ষা তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয়। তবে এর ফলাফল স্ট্রিপ পদ্ধতির মত নির্ভরযোগ্য নয়।
এক্ষেত্রে কাপড়ের নমুনা সাধারণত ৬ ইঞ্চি x ৪ ইঞ্চি মাপের হয়ে থাকে। যে কাপড়ের শক্তি নির্ণয় করতে হবে সেখান থেকে দৈব নমুমায়ন পদ্ধতিতে টানা সুতার দিকে কাপড়ের শক্তি নির্ণয়ের জন্য টানা সুতার দিকে ৬ ইঞ্চি এবং পড়েন সুতার দিকে ৪ ইঞ্চি নমুনা কাটা হয় ।

আবার পড়েন সুতার দিকে কাপড়ের শক্তি নির্ণয়ের জন্য পড়েনের দিকে ৬ ইঞ্চি (দৈর্ঘ্য) এবং টানা সুতার দিকে ৪ ইঞ্চি (প্রস্থ) নমুনা হিসাবে নেয়া হয়। এরপর ১ ইঞ্চি x ১.৫ ইঞ্চি মাপের দুটি ক্যাম্পের মধ্যে কাপড়টিকে এমনভাবে আটকাতে হবে যেন দুই পাশেই সমান প্রস্থের কাপড় বের হয়ে থাকে এবং সুতাগুলো পরস্পর সমান্তরাল থাকে। পরীক্ষা শুরুর প্রাথমিক অবস্থায় ক্ল্যাম্পদ্বয়ের দূরত্ব ৩ ইঞ্চি থাকে। এরপর মেশিন চালু করলে যে পরিমাণ শক্তিতে কাপড় ছিঁড়ে যায় তাই উক্ত কাপড়ের শক্তি; এভাবে কয়েকটি পরীক্ষা করে গড় শক্তি নির্ণয় করা যায়।
টিয়ারিং টেস্ট (Tearing test) :
টিয়ার শব্দের অর্থ ছিঁড়ে ফেলা বা ছিন্ন করা, কাপড়ের ক্ষেত্রে এর টিয়ারিং শক্তি একটি বিরাট ভূমিকা রাখে । কোন কাপড়ের টিয়ারিং শক্তি বলতে এর টানা বা পড়েন সিরিজের সুতাগুলো যে পরিমাণ টিয়ারিং টান সহ্য করতে পারে তা বুঝায়। যে সমস্ত কাপড় খুব অল্প টানে বা শক্তিতে ছিঁড়ে যায় তাদেরকে নিম্নমানের উৎপাদিত পণ্য হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।
এ সমস্ত কাপড় সাধারণত কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে অর্থাৎ যেখানে শক্তি প্রযুক্ত হয় না বললেই চলে সে কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন- ব্যান্ডেজ তবে টিয়ারিং টেস্টে দেখা যায় যে, কাপড়ের সুতাগুলো আলাদা আলাদাভাবে বা ছোট ছোট গ্রুপ আকারে ছিঁড়ে যায়, এজন্য সুতার একক শক্তি খবুই গুরুত্বপূর্ণ। তবে হাই সেট (High set) কাপড়ের ক্ষেত্রে সহজে এ ধরনের গ্রুপিং হয় না।
(ক) ট্রাপিজয়েড টেস্ট (Trapezoid Test) :
যদি কোন কাপড়ের একটি ছোট টুকরার এক প্রান্ত কাঁচির সাহায্যে সামান্য কেটে তারপর টুকরাটিকে দু হাত দিয়ে দু দিকে টেনে কাটা জায়গায় ছিঁড়া হয় অর্থাৎ কাপড় বিক্রেতারা যেভাবে কাপড়কে ছিঁড়ে ভাগ করেন। এটা আমেরিকান সোসাইটি কর্তৃক অনুমোদিত একটি আদর্শ পদ্ধতি ।


কাপড়ের যে দিকের শক্তি নির্ণয় করতে হবে সেদিকে ৬ ইঞ্চি এবং অন্যদিকে ৩ ইঞ্চি নিয়ে নমুনা কাটা হয়। নমুনাসমূহ কাটার পর সমদ্বিবাহু ট্রাপিজয়েডের আকারবিশিষ্ট একটি টেমপ্লেটের সাহায্যে নমুনাগুলো চিহ্নিত করা হয়।
ট্রাপিজয়েডটির উচ্চতা ৩ ইঞ্চি যার একপ্রান্ত ৪ ইঞ্চি এবং অপর প্রান্ত ১ ইঞ্চি চওড়া। ট্রাপিজয়েডটি এমনভাবে কাপড়ের উপর রাখতে হবে যেন এর ১ ইঞ্চি চওড়া প্রান্ত নমুনার ৬ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের সমান্তরাল থাকে। এরপর চিত্র অনুযায়ী A ও B রেখা দুটি টানা হয় যাতে পরীক্ষণ যন্ত্রের ক্ল্যাম্প D ও E এর মধ্যে সুবিধামত স্থাপন করা যায়। নমুনাটি স্থাপন করে C স্থানে সামান্য কেটে যন্ত্র চালনা করে ভার চাপানো হয়, যে ভারে নমুনাটি ছিঁড়ে যাবে বা পরীক্ষিত কাপড়ের শক্তি প্রকাশ করবে।

(খ) টাং টেস্ট (Tongue test) :
যদি কোন কাপড়ের ছোট একটি টুকরার অর্ধেক পর্যন্ত কাঁচি দিয়ে কেটে নেয়ার পর বাকি অংশটুকু টেনে ছিড়ে ফেলা হয় তাহলে এ পদ্ধতি সম্বন্ধে ধারণা করা যাবে। এ পরীক্ষার জন্য কাপড়ের যে দিকের শক্তি পরীক্ষা করতে হবে সে দিকে ৩ ইঞ্চি এবং অন্যদিকে ৮ ইঞ্চি নিয়ে নমুনার টুকরা তৈরি করা হয়। এরপর নমুনাটির প্রস্থের ঠিক মধ্যবিন্দু দিয়ে দৈর্ঘ্যের সমান্তরাল করে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত কেটে নিতে হবে। এখন নমুনাটিকে ৩ ইঞ্চি দূরত্বে রাখা দুটি ক্ল্যাম্পের মাঝখানে আটকিয়ে মেশিন চালনা করলেই শক্তি নির্ণয় করা যাবে।

তবে যে সকল কাপড়ের ইঞ্চি প্রতি টানা ও পড়েন সুতার সংখ্যা বেশি সে সকল কাপড়ের টাং টিয়ার টেস্টের সাহায্যে পরীক্ষা করা বেশ অসুবিধাজনক। এ জন্য বুননকৃত কাপড়ের শক্তি পরীক্ষার জন্য টাং টেস্টের চেয়ে ট্রাপিজয়েড পদ্ধতিই বেশি সুবিধাজনক ।
বাস্টিং টেস্ট (Bursting test)
বার্স্ট অর্থ ফেটে যাওয়া। এ পরীক্ষণের মাধ্যমে মূলত কাপড়ের ফেটে যাওয়ার শক্তিই নির্ণয় করা হয়। এ পদ্ধতি মূলত কাগজ শিল্পে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে কাপড়ের শক্তি নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু কিছু কাপড় যেমন নিটেড কাপড় বা ফেস্টেড কাপড়, যা স্ট্রিপ টেস্টের সাহায্যে পরীক্ষা করা অসুবিধাজনক। সেক্ষেত্রে উক্ত কাপড়ের শক্তি নির্ণয়ের জন্য বার্স্টিং টেস্ট সুবিধাজনক। এ সমস্ত কাপড়ে একদিকে শক্তি প্রয়োগ করলে তা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যায় ।
এ জন্য এ পদ্ধতিতে কাপড়ের উপর বিভিন্ন দিকে (Multi-directionally) একসাথে শক্তি প্রয়োগ করা হয়। কাপড়ের বাস্টিং শক্তি পরীক্ষার জন্য দু ধরনের মেশিন ব্যবহার করা হয়।
১। যান্ত্রিক ধরনের বাস্টিং স্ট্রেংথ টেস্টার (Mechanical type bursting strength tester)
২। হাইড্রলিক ধরনের বাস্টিং স্ট্রেংথ টেস্টার (Hydraulic pressure type bursting strength tester)
নিচে হাইড্রলিক প্রেসার টাইপ বাস্টিং স্ট্রেংথ টেস্টার পদ্ধতিতে কাপড়ের শক্তি নির্ণয়ের পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো :

কাপড়ের বাস্টিং শক্তি নির্ণয়ের জন্য কাপড়ের নমুনা নিয়ে পাতলা রাবারের পর্দার উপর ক্ল্যাম্পের সাহায্যে আটকানো হয়। তারপর পাম্পের সাহায্যে পাত্রের পানি বা তৈলে চাপ প্রয়োগ করা হয় ফলে রাবারের পদ্ধতিটি বেলুনের মত আস্তে আস্তে প্রসারিত হয়ে উপরের দিকে ফুলে উঠতে থাকে এবং সে সাথে কাপড়টিও ফুলতে থাকে এভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত কাপড়টি ফেটে না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত চাপ বৃদ্ধি করা হয়। যে চাপে কাপড়টি ফেটে যা তাৎক্ষণিকভাবে যন্ত্রের সাথে লাগানো ইন্ডিকেটর ডায়াল থেকে পাওয়া যায়।